দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে মাদকবিরোধী অভিযানে আটক পাঁচ ব্যক্তিকে জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে সোপর্দ না করে সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ে পাঠিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সাজা দেওয়ার ঘটনায় আইনগত প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন আদালত। এ ঘটনায় ঘোড়াঘাট থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শহিদুল ইসলামকে কারণ দর্শানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ঘোড়াঘাট আমলি আদালতের সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. মোস্তানছির রহমান গত ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে মিস কেস নং-০১/২০২৬ (ঘোড়াঘাট) মামলায় এ আদেশ দেন।
আদালতের আদেশ অনুযায়ী, আগামী ২৭ অক্টোবর ২০২৬ সকাল ১০টায় মো. শহিদুল ইসলামকে আদালতে স্বশরীরে হাজির হয়ে ঘটনার বিষয়ে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট যাবতীয় নথি, অভিযানসংক্রান্ত জিডি, আসামিদের সোপর্দকরণ ও ফরওয়ার্ডিংসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আদালতে উপস্থাপনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আদালতের নথিতে বলা হয়েছে, গত ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ মাদকবিরোধী অভিযান নিয়ে ‘২৪ ঘন্টা ঘোড়াঘাট থানা নিউজ’–এর সাংবাদিক ও দিনাজপুর ঘোড়াঘাট প্রতিনিধি মো. মোফাজ্জল হোসেন কর্তৃক প্রকাশিত একটি সংবাদ আদালতের দৃষ্টিগোচর হয়।
ওই সংবাদে উল্লেখ করা হয়, মাদকবিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে ঘোড়াঘাট থানা পুলিশের বিভিন্ন অভিযানে মাদক সেবনের অভিযোগে পাঁচজনকে আটক করা হয়। পরে আটক ব্যক্তিদের থানায় নেওয়ার পর সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ে হাজির করা হয়।
আদালতের নথি অনুযায়ী, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. আব্দুল্লাহ আল-মামুন কাওসার শেখ ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রম পরিচালনা করেন।
ওই কার্যক্রমে পাঁচজনের মধ্যে চারজনকে ছয় মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং একজনকে সাত দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। একই সঙ্গে প্রত্যেককে ১০০ টাকা করে অর্থদণ্ড দেওয়া হয়।
আদালতের আদেশে ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮-এর ৬১ ও ১৬৭ ধারার বিধান উল্লেখ করা হয়েছে। আদেশে বলা হয়, কোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের পর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তদন্ত সম্পন্ন করা সম্ভব না হলে সংশ্লিষ্ট আসামিকে নিকটস্থ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে সোপর্দ করার বিধান রয়েছে।
এ ছাড়া পুলিশ রেগুলেশনস, বেঙ্গল (PRB), ১৯৪৩-এর বিধি ৩২৪-এর বিষয়টিও আদালতের আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে।
আদালতের পর্যবেক্ষণে প্রাথমিকভাবে প্রতীয়মান হয়েছে, ঘোড়াঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আটক ব্যক্তিদের জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির না করে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট/সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ে পাঠিয়েছেন। আদালত মনে করেন, বিষয়টি উল্লিখিত আইন ও বিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা ব্যাখ্যার প্রয়োজন রয়েছে।
আদেশে আরও বলা হয়েছে, ফৌজদারি কার্যবিধির ৬ ও ৭ ধারার বিধান অনুযায়ী নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আদালত আইনানুগভাবে সংঘটিত বা উদঘাটিত অপরাধের বিচার করতে পারেন। তবে আদালতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, মাদকবিরোধী অভিযানে পুলিশ কর্তৃক আটক ব্যক্তিকে সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ে এনে মোবাইল কোর্টে বিচার করার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য আইনগত সুযোগ ও প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
আদালতের সার্বিক পর্যালোচনায় ঘোড়াঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আইনগত বিধান প্রতিপালনে গাফিলতি করেছেন কি না, সে বিষয়ে প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। আদেশে উল্লেখ করা হয়েছে, বিষয়টি প্রমাণিত হলে পুলিশ আইন, ১৮৬১-এর ২৯ ধারা এবং দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ১৬৬ ধারার আওতায় শাস্তিযোগ্য অপরাধের প্রশ্ন উঠতে পারে।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—আদালতের আদেশে এসব বিষয় প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ ও আইনগত প্রশ্ন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আদালত এখনো এ ঘটনায় ওসি মো. শহিদুল ইসলামকে দোষী সাব্যস্ত করেছেন—এমন কোনো সিদ্ধান্ত আদেশে নেই। বরং ঘটনার বিষয়ে তার ব্যাখ্যা শোনার জন্যই তাকে স্বশরীরে হাজির হতে বলা হয়েছে।
এদিকে ঘোড়াঘাট থানা সূত্রে জানা গেছে, আদালতের ওই আদেশের দুই দিন পর, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ঘোড়াঘাট থানার তৎকালীন ওসি মো. শহিদুল ইসলামকে বদলি করা হয়েছে। তাকে রংপুর রেঞ্জ ডিআইজির কন্ট্রোল রুমে বদলি করা হয়েছে বলে থানা সূত্র জানিয়েছে।
অর্থাৎ, আদালতের ১৬ সেপ্টেম্বরের আদেশের সময় তিনি ঘোড়াঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্বে থাকলেও ১৮ সেপ্টেম্বরের পর তিনি আর ওই থানার দায়িত্বে নেই।
তবে বদলির সঙ্গে আদালতের কারণ দর্শানোর আদেশের কোনো সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, সে বিষয়ে কোনো তথ্য আদালতের আদেশে উল্লেখ নেই। তাই দুই ঘটনাকে একই কারণে হয়েছে—এমন কোনো দাবি না করে পৃথক ঘটনা হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী আগামী ২৭ অক্টোবর সকাল ১০টায় সাবেক ওসি মো. শহিদুল ইসলামকে স্বশরীরে আদালতে হাজির হয়ে লিখিত ব্যাখ্যা দেওয়ার কথা রয়েছে। একই সঙ্গে ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র আদালতে উপস্থাপন করা হবে।
মন্তব্য করুন