
দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক দপ্তরী কাম নৈশপ্রহরীর বিরুদ্ধে ভুয়া কাগজপত্র ও বয়স জালিয়াতি করে চাকরি বহাল রাখার চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। উপজেলার বেলায়া আদিবাসী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দপ্তরী খোরশেদ আলম (শামীম)-এর এই বয়স সংশোধন ও নিয়োগ বিতর্ক নিয়ে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ও মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে।
অনুসন্ধান ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বিগত সরকারের আমলে স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের জোরালো সুপারিশে ২০১৮ সালে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে বেলায়া আদিবাসী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দপ্তরী কাম নৈশপ্রহরী পদে শামীমকে নিয়োগ দেওয়া হয়।
অভিযোগ রয়েছে, সরকারি নিয়োগ বিধিমালা অনুযায়ী এই পদে যোগদানের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৩০ বছর হওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও শামীমের ক্ষেত্রে তা মানা হয়নি। নিয়োগের সময় শামীমের জমা দেওয়া জন্মনিবন্ধন সনদে জন্ম সাল ১৯৯০ উল্লেখ করা হলেও, তার জাতীয় পরিচয়পত্রের (NID) তথ্য অনুযায়ী প্রকৃত জন্ম সাল ১৯৮২। সেই হিসাবে নিয়োগের সময়ই তার বয়স নির্ধারিত সীমার চেয়ে অন্তত ৬ বছর বেশি ছিল বলে তথ্য প্রমাণে দাবি করছেন অভিযোগকারীরা।
বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে ২০২৩ সালের ১৬ আগস্ট তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ফারুক আহমেদ ও বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির (এসএমসি) সভাপতি জামাত আলী মন্ডল চাকরি নবায়নের সময় শামীমের বয়সের জালিয়াতি নিয়ে তীব্র আপত্তি তোলেন। তারা এই বিষয়ে উপজেলা শিক্ষা অফিসে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগের পর কয়েক মাস শামীমের সরকারি বেতন-ভাতা বন্ধ থাকলেও, পরবর্তীতে অজ্ঞাত কারণে তার চাকরি পুনরায় নবায়ন করা হয়।
চাকরি টিকিয়ে রাখতে শামীম পরবর্তীতে বয়স সংশোধনের এক অভিনব কৌশল নেন। তিনি উপজেলার ২নং পালশা ইউনিয়ন পরিষদ থেকে নিজেকে পরিবারের দুই বোনের ছোট দাবি করে একটি উত্তরাধিকার সনদ সংগ্রহ করেন। তবে এই সনদ নিয়ে খোদ ইউপি চেয়ারম্যানই জালিয়াতির অভিযোগ তুলেছেন।
২নং পালশা ইউপি চেয়ারম্যান কবিরুল ইসলাম বলেন, "কৌশলে আমার স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে। পরে খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছি, শামীম আসলে তার পরিবারের সবার বড়। সে বড় হয়েও নিজেকে ছোট দেখিয়ে ভুয়া সনদ নিয়েছে।"
অভিযোগ রয়েছে, ইউপি চেয়ারম্যানের কাছ থেকে নেওয়া ওই বিতর্কিত সনদের ওপর ভিত্তি করেই শামীম তার জন্মনিবন্ধনের তথ্য সংশোধন করেন। এরপর শিক্ষা অফিসে জমা দেওয়ার জন্য বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মাহমুদা শিল্পীর অগোচরে তার স্বাক্ষর জাল করে একটি প্রত্যয়নপত্র তৈরি করা হয়।
এ বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মাহমুদা শিল্পী স্পষ্ট ভাষায় বলেন, "শামীমের বয়স সংশোধনের প্রত্যয়নপত্রে থাকা স্বাক্ষরটি আমার নয়। এটি সম্পূর্ণ জালিয়াতি করা হয়েছে।"
জালিয়াতি ও বয়স সংশোধনের এই গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত দপ্তরী খোরশেদ আলম (শামীম) সংক্ষিপ্ত জবাবে বলেন, "আমার কাগজপত্রে কিছু সমস্যা ছিল, তাই আমি তা সংশোধন করেছি।" তবে প্রধান শিক্ষকের স্বাক্ষর ও ভুয়া সনদের বিষয়ে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।
সরকারি চাকরিতে এমন প্রকাশ্য জালিয়াতির ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে স্থানীয় সচেতন মহল। তারা অবিলম্বে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন এবং একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটির মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করে দোষী ব্যক্তির বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।